সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল?

২০১৯ সাল থেকে ছয়বার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ইসরায়েলের নাগরিকেরা। দীর্ঘ এই সময়ে দেশটির রাজনীতিতে বারবার দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবির কিংবা তার বিরোধীরা- কেউই টেকসই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বারবার, আর তার পরিণতিতে নতুন নির্বাচনের পথে হাঁটতে হয়েছে ইহুদিবাদী দখলদার ভূখণ্ডটিকে।

ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন। দেশটির কোনও একক দলই কখনও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। তাই সরকার গঠনের জন্য দলগুলোকে জোট বাঁধতে হয়। কিন্তু আদর্শিক মতপার্থক্য, রাজনৈতিক বিরোধ এবং জোটের শরিকদের মধ্যে মতানৈক্যের কারণে সেই জোট অনেক সময় বেশিদিন টেকে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থিতিশীল সরকার গঠন সম্ভব না হলে কিংবা ক্ষমতাসীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে আবারও নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়।

২০১৯ সালে রাজনৈতিক এই অচলাবস্থা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে বছর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবিরকে সরকার গঠনে বাধা দেন ডানপন্থী নেতা আভিগদর লিবারম্যান। অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের তরুণদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগের বিধানসংবলিত একটি বিল অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস করার শর্ত দেন তিনি।

নেতানিয়াহু সেই শর্ত পূরণ করতে না পারায় জোট গঠন ব্যর্থ হয়। ফলে একই বছরের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয়বার ভোট গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেই নির্বাচনেও কোনও পক্ষ সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

এরপর ২০২০ সালে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ দর-কষাকষির পর নেতানিয়াহু ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্তজের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি ঐক্য সরকার গঠিত হয়। তবে সেই সরকারও বেশিদিন টেকেনি। বাজেট পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় ওই বছরের ডিসেম্বরে সরকারের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল আবারও নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায়।

২০২১ সালে চতুর্থ নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আটটি দল মিলে একটি জোট গঠন করে। নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত ওই জোটে ডানপন্থী, মধ্যপন্থী ও বামপন্থী-ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের দলও ছিল। নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটানোই ছিল তাদের প্রধান অভিন্ন লক্ষ্য। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের নেতানিয়াহু-শাসনের অবসান ঘটে।

কিন্তু আদর্শিক মতপার্থক্য ও জোটের ভেতরে ভাঙনের কারণে সরকার বেশিদিন টেকেনি। কয়েকজন সংসদ সদস্যের পক্ষত্যাগে জোটটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। এবার তিনি ডানপন্থী ও অতি-ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠন করেন এবং পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।

ইসরায়েলে ঘন ঘন নির্বাচনের পেছনে মূল কারণ হলো সংসদে কোনও দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা এবং জোট সরকারগুলোর ভঙ্গুর ভিত্তি। সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন মতাদর্শের দলকে একসঙ্গে আনতে হয়। কিন্তু ক্ষমতা ভাগাভাগি, সামরিক নিয়োগনীতি, বাজেট এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সেই জোট ভেঙে পড়ে। তখন রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর উপায় হিসেবে আবারও নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

এভাবে ২০১৯ সাল থেকে সাত বছরের মধ্যে ছয়টি জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হয়েছে ইসরায়েল। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জোট সরকার গঠনের বাধ্যবাধকতা এবং দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতার অভাবই এই পুনরাবৃত্ত নির্বাচনের প্রধান কারণ। সূত্র: আল-জাজিরা

(ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক)।