বাংলাদেশের বিনোদন জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত। একাধারে তিনি উপস্থাপক, পরিচালক, লেখক ও প্রযোজক। আশির দশক থেকে শুরু করে টানা তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের সবচাইতে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি হাস্যরসের আঙ্গিকে নানা অসঙ্গতি-দুর্নীতি-অনিয়ম তুলে ধরে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে একজন সমাজ সংস্কারকের ভূমিকা রেখে চলেছেন। তার গ্রন্থনা, পরিকল্পনা, উপস্থাপনা এবং পরিচালনায় দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে ‘ইত্যাদি’ চলছে সমানতালে, সমান জনপ্রিয়তায়। তিনি আমাদের একজনই হানিফ সংকেত। ১৯৮৯ থেকে ২০২৫… ৩৬ বছর… এই দীর্ঘ সময় ধরে আপনি ‘ইত্যাদি’ নির্মাণ করছেন! বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন ধারাবাহিকতা অপ্রতুল। দীর্ঘদিন কোনো কাজে লেগে থাকাটা সম্ভবত বাঙালির রক্তে নেই। আপনার এই ধারাবাহিকতার রহস্য কী?হানিফ সংকেত : কোন রহস্য নেই, কারণ আছে। আর তা হচ্ছে দায়বোধ এবং মানুষের ভালোবাসা। আমি আমার দায়বোধ থেকে দেশের জন্যে, সমাজের জন্যে, মানুষের জন্যে কাজ করতে চেষ্টা করি।
সেই নব্বই দশক থেকেই আমরা শেকড়ের সন্ধানে ‘ইত্যাদি’কে স্টুডিওর চার দেয়াল থেকে বের করে গিয়েছি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, দেশকে জানতে এবং জানাতে। উদ্দেশ্য দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যসহ জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো তুলে ধরা। তুলে ধরতে চেষ্টা করি সেইসব স্থানের প্রচার বিমুখ নিরব সমাজ সচেতন সমাজকর্মীদের ও জনকল্যাণে নিয়োজিত মানুষদের। উপহার দেয়া হয় নতুন নতুন প্রতিভা। বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে সমাজ সংস্কার ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করি। সময়ের সাথে এগিয়ে যায় ‘ইত্যাদি’। আর সেজন্যেই ‘ইত্যাদি’ দেখেন সব শ্রেণি পেশার মানুষ। দর্শকরা তাদের মূল্যবান সময় বের করে ‘ইত্যাদি’ দেখছেন সেই ব্যাটারিচালিত টিভি দেখার দিন থেকে বর্তমানের অনলাইনের যুগ পর্যন্ত। দর্শকদের ভালোবাসা আর সমর্থনের কারণেই ইত্যাদির এই দীর্ঘযাত্রা সম্ভব হচ্ছে। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে অবদান রাখা থেকেই আপনি অনুপ্রেরণা পান?হানিফ সংকেত : আমার অনুপ্রেরণা ‘ইত্যাদি’র বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে উপকৃত হওয়া অসহায় মানুষ ও তাদের পরিবারের মুখের হাসি। ‘ইত্যাদি’র প্রতিবেদন দেখে কেউ যখন অনুপ্রাণিত হয়ে জনকল্যাণে এগিয়ে আসেন তখন আমিও অনুপ্রাণিত হই। বাজিতপুরের হাওরের ভাসমান স্কুলে একসময় জীবন বাজী রেখে ছোট একটি নৌকায় করে স্কুলে আসতো শিক্ষার্থীরা, ইত্যাদির মাধ্যমে একটি বড় ইঞ্জিনবোট পেয়ে সেই কিশোর-কিশোরীরাই যখন আনন্দে গান গাইতে গাইতে স্কুলে আসে, সেই চিত্র আমাকে অনুপ্রাণিত করে। কিংবা সর্বশেষ ঝিনাইদহের অনুষ্ঠানে মিরসরাইয়ের পাহাড়ি এলাকা তালবাড়িয়া ত্রিপুরা পাড়ায় তিনযুগ ধরে পানির সংকটে থাকা ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী ইত্যাদির মাধ্যমে গভীর নলকূপে পেয়ে যখন উচ্ছ্বসিত করতালি আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তখন অনুপ্রাণিত হই। যখন দেখি ‘ইত্যাদি’র করা প্রতিবেদনের কারণেই ভেজাল পণ্য বিক্রির জন্য মোবাইল কোর্ট শুরু হয়েছে, ‘ইত্যাদি’তে দেখানো অনেক অনিয়ম রোধে ব্যবস্থা নেয়া হয় তখন অনুপ্রাণিত হই। এমনি শত শত অনুপ্রেরণার ঘটনা রয়েছে ‘ইত্যাদি’র দীর্ঘ জীবনে। এই ৩৭ বছরে ‘ইত্যাদি’র শত শত মানবিক প্রতিবেদন মানুষকে ভাবিয়েছে, কাঁদিয়েছে। নানারকম জীবনের গল্প মনুষ্যত্বকে দাঁড় করিয়েছে বিবেকের কাঠগড়ায়। এই সব মানুষের কাজ দেখে মমতায় আদ্র হয়েছে কোটি কোটি দর্শকের চোখ, তখন আবেগাপ্লুত হয়েছি। যখন দেখি ‘ইত্যাদি’তে দেখানো প্রচারবিমুখ মানুষগুলো বিভিন্ন স্থানে পুরস্কৃত হচ্ছেন, সম্মানিত হচ্ছেন, পাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার-তখন ভালো লাগে, অনুপ্রাণিত হই। কারণ এরা কেউ পুরস্কারের জন্য কাজ করেনি বরং তারা দায়িত্ববান বলেই পুরস্কৃত হয়েছেন।(মোজাম্মিল হোসেন)