পানি ছাড়া মানুষের জীবন কল্পনা করা কঠিন। তৃষ্ণা মেটানো থেকে শুরু করে গোসল, পরিচ্ছন্নতা কিংবা দৈনন্দিন নানা কাজে পানির প্রয়োজন। কিন্তু সেই পানিই যদি কারও শরীরে তীব্র ব্যথা, চুলকানি আর ফুসকুড়ির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে স্বাভাবিক জীবনযাপন কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
কার্ডিফের ২৫ বছর বয়সী শেরেল ফারুগিয়ার ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটছে। পানির সংস্পর্শে এলেই তার শরীরে ছোট ছোট দানা বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এসব জায়গায় শুধু চুলকানিই নয়, তীব্র ব্যথাও অনুভূত হয়। আক্রান্ত হওয়ার পর পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে বেশ কিছুটা সময় লাগে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই বিরল অবস্থার নাম ‘অ্যাকুয়াজেনিক আর্টিক্যারিয়া’। সাধারণভাবে একে পানিতে অ্যালার্জি বলা হলেও বিষয়টি আসলে আরও জটিল। পানির সংস্পর্শে ত্বকে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়াই এই রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
শেরেলের ভাষায়, এটি মূলত ত্বকের একটি বিশেষ অবস্থা। মানবদেহের বড় একটি অংশ পানি দিয়ে তৈরি হলেও তার ত্বকে পানির সংস্পর্শ হলেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
শৈশব থেকে এই সমস্যায় ভুগছিলেন না শেরেল। সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহ পর তিনি প্রথম এ রোগের উপসর্গ অনুভব করেন। এরপর ধীরে ধীরে পানি তার দৈনন্দিন জীবনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে পানি পান করতে তার কোনো সমস্যা হয় না। শরীরের ভেতরে পানি প্রবেশ করলে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না বলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই পানি ও অন্যান্য তরল পান করতে পারেন।
সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে গোসল করা। শেরেল জানান, তিনি দুই থেকে তিন মিনিটের বেশি গোসল করতে পারেন না। এর বেশি সময় পানির সংস্পর্শে থাকলে তার শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই গোসলের আগে শ্যাম্পু, কন্ডিশনারসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত করে রাখেন। এরপর দ্রুত গোসল শেষ করেন।
বৃষ্টিও তার জন্য বড় আতঙ্কের বিষয়। অন্যদের কাছে বৃষ্টিতে ভেজা হয়তো আনন্দের কিংবা রোমান্টিক কোনো অভিজ্ঞতা হতে পারে, কিন্তু শেরেলের কাছে তা ভয়াবহ শারীরিক কষ্টের কারণ।
মুষলধারে বৃষ্টি হলে তিনি বাইরে বের হন না। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে আগে থেকেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নেন। তবে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় বসবাস করায় সবসময় সতর্ক থেকেও পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয় না।
নতুন সন্তানকে সামলানোর পাশাপাশি গত কয়েক মাস ধরে এই বিরল রোগের সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে শেরেলকে। তার রোগের উপসর্গ দেখে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরাও প্রথমদিকে বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো গুরুতর কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
নিজের রোগ সম্পর্কে জানার পর সেটিকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবেই মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন শেরেল। এমনকি শরীরে একটি বৃষ্টির ফোঁটা ও ছাতার ট্যাটুও করিয়েছেন, যা তার পানির সঙ্গে তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক সম্পর্কের প্রতীক।
রোগটির চিকিৎসা নিয়েও এখনো পুরোপুরি স্বস্তি পাননি তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শে শক্তিশালী অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ ব্যবহার করলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য চিকিৎসার মধ্যে ইউভি থেরাপির কথাও বলা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে ত্বকের কোষকে কিছুটা শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়। তবে এরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে।
শেরেলকে একজন চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরেকটি সন্তান নিলে তার এই শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। সেই সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে তিনি স্বামীকে আরেকটি সন্তান নেওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। তবে কোনো চিকিৎসকই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না যে দ্বিতীয় সন্তান হলে তিনি এই রোগ থেকে সেরে উঠবেন।
এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে তার স্বামীও খুব বেশি আশাবাদী নন। তাদের সন্তানের বয়স এখনও খুব কম। তার ওপর দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার পর শেরেলের শারীরিক অবস্থা কী হবে, সেটিও অনিশ্চিত।
বিরল এই রোগের কারণে স্বাভাবিক জীবনের অনেক সাধারণ কাজই শেরেলের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। তবু সন্তান ও পরিবারকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। পানির সঙ্গে প্রতিদিনের এই লড়াই কবে শেষ হবে, সেই উত্তর এখনো অজানা।
রিপোর্ট করেছেনঃ মাহফুজুল ইসলাম।