ভোটের দিন ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে থাকবে সেনাবাহিনী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা গতকাল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা গতকাল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। তবে ছাত্রী হলে রাত ১০টার পর প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেই সঙ্গে মানতে হবে কড়া আচরণবিধি। এবারের নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী মোট ৪৭১ জন। ৩৮ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।ভোট কেন্দ্রে এবার থাকবে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রথম স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা, দ্বিতীয় স্তরে পুলিশ এবং তৃতীয় স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রবেশমুখে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে অবস্থান নেবে সেনাবাহিনী।বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে গতকাল ডাকসু ও হল সংসদের প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার মতবিনিময় সভা হয়। এরপর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৯ সেপ্টেম্বর ভোটের দিন আটটি কেন্দ্রে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াও হলে বহিরাগত প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা এবং ভোটারদের জন্য অতিরিক্ত বাস ট্রিপ দেয়া হবে। একই সঙ্গে ভোট গণনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রবেশমুখে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকলেও প্রয়োজন হলে ক্যাম্পাসেও প্রবেশ করবে। ভোট শেষে ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভোট কেন্দ্র কর্ডন করে রাখবেন সেনাসদস্যরা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বরাত দিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানান, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। এরই মধ্যে টহল টিমসহ সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো সক্রিয় রয়েছে। নির্বাচনের সাতদিন আগে থেকে আবাসিক হলে কোনো বহিরাগত থাকতে পারবে না। নিয়মিত টহল পরিচালনার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভোটের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পুরোপুরি সিলগালা থাকবে। বৈধ শিক্ষার্থী, অনুমোদিত সাংবাদিক ও নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি ভোটের আগের দিন ৮ সেপ্টেম্বর ও ভোটের দিন ৯ সেপ্টেম্বর মেট্রোরেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকবে বলেও জানানো হয়।

যেসব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন, ভোট দেয়ার জন্য তাদের বিভিন্ন রুটে বাসের অতিরিক্ত ট্রিপের ব্যবস্থা করা হবে। এসব বাস নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দেয়া হবে। সিনেট ভবনের বৈঠকে এসব নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো প্রার্থী দ্বিমত পোষণ করেননি বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন সভায় সভাপতিত্ব করেন। এ সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা, অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক এসএম শামীম রেজা, অধ্যাপক তারিক মনজুর, সহযোগী অধ্যাপক শারমীন কবীর এবং হল রিটার্নিং কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা এবং সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সভায় রিটার্নিং কর্মকর্তারা বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন।

এদিকে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্যানেলগুলো তাদের এ প্রচার কার্যক্রম সূচনা করে। এর মধ্যে বেলা সাড়ে ৩টায় ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল ভিসি চত্বরে মহান একাত্তরের শহীদদের স্মৃতিফলক ‘স্মৃতি চিরন্তনে’ শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সকালে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রচার কার্যক্রম সূচনা করে বাম সমর্থিত প্রতিরোধ পর্ষদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দুপুরের দিকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’। সেখানে এ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা, জিএস প্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়াসহ প্যানেলের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় উমামা ফাতেমা বলেন, ‘ডাকসু যেন নিয়মিত এবং অনাড়ম্বরভাবে আয়োজিত হতে পারে, সেটি প্রশাসনকে দেখতে হবে। প্রচার-প্রচারণা এমনভাবে করব, যেন শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। অনেক প্রার্থী ১০-১৫ দিন আগে থেকেই অলিখিতভাবে প্রচার চালিয়েছে। আমরা বারবার বললেও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা আশা করব, যে বিধিমালা তারা দিয়েছে, সেখানে যেন প্রশাসন থাকে।’

ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে গতকাল দুপুর থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এলাকায় কার্যক্রম শুরুর পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, ‘আমরা কেমন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করতে চাই, সে রূপরেখা শিক্ষার্থীদের দেয়া উচিত। কিন্তু আমরা যদি প্রোপাগান্ডা করি, ট্যাগিং এবং ফ্রেমিংয়ের রাজনীতি করি, তাহলে শিক্ষার্থীরা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই।’

এসব প্যানেলের বাইরেও স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন অনেকে। গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মোদ্দাসসীর চৌধুরী কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে গতকাল প্রচার চালান।

এদিকে চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা গতকাল বিকালে প্রকাশ করা হয়েছে। এবারের ডাকসু নির্বাচনে সব মিলিয়ে ২৮টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন মোট ৪৭১ প্রার্থী। এছাড়া প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ৩৮ জন।

তালিকা অনুযায়ী, ভিপি পদে লড়ছেন ৪৫, জিএস প্রার্থী ১৯ এবং এজিএস পদে ২৫ জন। সম্পাদক পদগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে ১৭; কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ১১; আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ১৪; সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ১৯; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ১২; গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ৯; ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১৩; ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১২; সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৭; স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ১৫; মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১ এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১৫ প্রার্থী। সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে সদস্য পদে। ১৩টি পদের বিপরীতে এবার মোট প্রার্থী হয়েছেন ২১৭ জন।

প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন জমা দিলেও ২৮ জন তাদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে বাছাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ১০ প্রার্থী আপিল না করায় তাদের মনোনয়নপত্রও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। (মিসবাহ উদ্দিন)